ছাতকে ১৭০ বছর আগে নির্মিত ‘সাহেব মিনার’ হুমকির মুখে

ব্রিটিশ দম্পতির প্রেমের প্রোজ্জ্বল স্মারক

by

এ উপমহাদেশে ইংরেজদের রাজত্বের শুরুর দিকেই সুনামগঞ্জের ছাতকে ব্যবসা করতে এসেছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক জর্জ রাইট ইংলিশ। কথিত আছে তিনিই এই অঞ্চলে তথা বাংলাদেশে প্রথম চুনাপাথরের সূচনা ব্যবসায়ী। ব্রিটিশরা নিজেদের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে রেল-কলকারখানাসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ করায় ছাতক শিল্পশহরের মর্যাদা পায় কলোনি আমলে। ব্যবসায়িক উন্নতির কথা চিন্তা করে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির আহবানে এখানে ছুটে এসেছিলেন জর্জ। শেষে এখানেই মারা যান তিনি। তাকে ছাতকেই সমাধিস্থ করা হয়।

ছাতকে প্রায় ৫ দশক ব্যবসা করে তিনি সুনাম অর্জন করেন। স্থানীয়রা তাকে সাহেব বলে ডাকতেন। এই সাহেব ১৮৫০ সালে মারা যান। স্বামী বিয়োগে স্ত্রী হ্যানরী মুষড়ে পড়েন। 

স্বামীর মৃত্যুর পরেই পতির প্রেম শ্বাশ্বত করে রাখতে অক্ষয় নিদর্শন বা সৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। স্বামীকে সমাহিত করে ওই বছরই দৃষ্টিনন্দন সৌধ নির্মাণ করেন তাদের মালিকানাধীন টিলাটিতে। নির্মাণকাজ তদারকি করেন তিনি নিজেই। পরবর্তীতে টিলাটি ‘ইংলিশ টিলা ও সৌধটি ‘সাহেব মিনার’ হিসেবে খ্যাতি পায়। টিলায় নির্মিত সৌধের গায়ে এখনো মার্বেল পাথরের খোদাই করা বোর্ডে তাদের কীর্তিগাথা লেখা রয়েছে। ১৭০ বছর আগের নির্মিত সেই মিনারটি এখনো অক্ষত। তবে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। টিলাখেকো চক্র মাটি কেটে পুরো টিলা ও ঐতিহ্যের স্মারকটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়ায় উদ্বিগ্ন সুধীজন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির রাজত্ব শুরু হলে তাদের আমন্ত্রণে নিজ দেশের অনেকেই ব্যবসা করতে ছুটে আসেন এই উপমহাদেশে। তখন অভিভক্ত ভারতের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের ছাতকেও অনেক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ছুটে আসেন। জর্জ-ইংলিশও তাদের মধ্যে এমন একজন। তিনি কম্পানির আহবানে সপরিবারে ছুটেন এসেছিলেন। তার সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন নববিবাহিতা স্ত্রী হ্যানরীকেও। জর্জ বেছে নেন সুরমা নদীর পাড়ের নদী ও পাহাড়ঘেঁষা জনপদ ছাতককে। এখানেই চুনাপাথর ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন তিনি। ব্যবসায়িক উন্নতিতে আশানুরূপ লাভের দেখা পেয়ে সারা দেশে এমনকি বহির্বিশ্বেও তার ব্যবসা বিস্তৃত করেন। তাই এখানেই স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যবসার পাশাপাশি স্থানীয়দের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।

ভৌগোলিক কারণে অভিবক্ত ভারতের এই অঞ্চল চুনাপাথরের জন্য বিখ্যাত ছিল কলোনি আমল থেকে। বর্তমানে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকায় চুনাপাথর খনি ছিল। সহজলভ্যতার কারণে জমজমাট চুনাপাথর বাজার গড়ে ওঠে। বলতে গেলে এই ব্যবসার একক কর্তৃত্ব ছিল জর্জের হাতে। ব্রিটিশরা সারা দেশে অবকাঠামো নির্মাণে মনোনিবেশ করায় তিনিও চুনাপাথর ব্যবসা করে যাচ্ছিলেন সাচ্ছন্দ্যে।

জর্জ টানা ৫ দশক সুনামের সঙ্গে চুনাপাথর ব্যবসা করেন। স্থানীয় মানুষজনও তাকে ভালোবাসত। তার স্ত্রী হ্যানরী ইংলিশও ছিলেন মায়াবতি দরদী নারী। দুজন স্থানীয়দের ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন। ভালোবেসে তার স্বামীকে স্থানীয়রা সাহেব ডাকতেন। সেই জর্জ সাহেব ৭৬ বছর বয়সে একদিন বার্ধক্যকালীন অসুস্থতায় পড়েন। তখন তিনি নানা স্মৃতি রোমন্থণ করছিলেন। এই অঞ্চলের প্রতি তার প্রেম ও ভালোলাগার গল্প করতে থাকেন স্ত্রীর সঙ্গে। একদিন হ্যানরী ও তার সন্তানকে রেখে মারা যান জর্জ। স্বামীকে সমাহিত করে তার স্মৃতি ধরে রাখার পরিকল্পনা নেন হ্যানরী। এর মধ্যেই তিনি অনেকটা বর্গাকৃতির সুউচ্চ চুড়া নির্মাণ করেন। স্বামীর স্মৃতি রক্ষায় বাগবাড়ী মৌজার ৪৮৯ দাগের ১.৯৮ একর টিলার ওপর আকাশচুম্বি চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর স্মৃতিসৌধ নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন হ্যানরী। প্রায় ২৫ ফুট উঁচু, সাড়ে চারফুট চওড়া সৌধটির গায়ে মার্বেল পাথরে খোদাই করা ইংরেজি হরফে এই দম্পতির ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে। স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে স্ত্রীও হ্যানরীও শেষ বয়সে চলে যান ‌ব্রিটেনে। তিনি আর কখনো ফিরে আসেননি এই দেশে।

এরপর থেকেই ইংলিশ টিলা ও সাহেব মিনারের গল্প ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। জর্জ-হ্যানরীর শ্বাশ্বত প্রেম ও পরস্পরের প্রতি ভক্তির কথা জানতে পেরে মানুষজন এখানে এসে তাদের শ্রদ্ধা জানান। ধিরে ধিরে পর্যটনে রূপ নেয় টিলাটি। ব্রিটিশরা শাসন গুটিয়ে নিয়ে চলে গেলে সরকারের মালিকানায় চলে যায় ইংলিশ টিলা। এরপরই শুরু হয় অবহেলা আর অনাদর। নির্মাণের ১৭০ বছর অতিবাহিত হলেও খাঁটি নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার ও উন্নত ব্যবস্থাপনায় নির্মাণের কারণে এখনো অনেকটা অক্ষত আছে সাহেব মিনারটি। তবে এর চারপাশের মাটি কেটে বসতি স্থাপন, মাটি কেটে বিক্রির কারণে অনেকটা ঝঁ‚কিতে পড়েছে টিলাটি। তারপরও এর সৌন্দর্য্য দেখতে এখনো দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন পর্যটকরা। তারা এর সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়ে দম্পতির প্রতি ভালোবাসা জানাচ্ছেন। তবে এই সাহেব মিনারের গায়ে এখন বৃক্ষ গজিয়ে ওঠছে। সংস্কার না করায় সৌন্দর্য্য ও সুরক্ষা হুমকিতে পড়েছে।

পাকিস্তান আমলে ১৯৬৮ সালে বাগবাড়ি গ্রামের হাজী আবুল মহসিন তৎকালীন সিলেট জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ০৪/৬৩-৬৪ নং স্মারকে সাহেব মিনারের ভূমি ইংলিশ টিলাটি বন্দোবস্ত নেন। তিনি বন্দোবস্তকৃত ভূমিতে বাগান করবেন এই শর্ত মেনেই বন্দোবস্ত নিয়েছেন। কিন্তু তিনি বা তার পরিবার কেউ কখনো বাগান না করেই অন্যায়ভাবে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার শুরু করেন। ১৯৮৭ সাল থেকে অন্যায়ভাবে টিলার মাটি বিক্রি শুরু করে ওই পরিবার। বন্দোবস্তের নিয়ম লঙ্ঘন করে কিছু অংশ কয়েকজনের কাছে বিক্রিও করে দেন। এই অবস্থায় ১৯৯৮ সালে আবারও বন্দোবস্ত নবায়ন করে নেন চতুরতার সঙ্গে। ১৯৯৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর টিলা থেকে মাটি কাটতে গিয়ে নারায়ন তালুকদার নামক এক শ্রমিক মারা যান। এভাবে চোখের সামনে দৃষ্টিনন্দন টিলাটির উপর অত্যাচার চালানো হয়। যার ফলে ঝ‚কির মুখে পরিণত হয় ঐতিহ্যবাহী এই টিলাটি। স্থানীয় সচেতন মানুষজনও তারে বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেন।

এই অবস্থায় বাগবাড়ি গ্রামের মনির উদ্দিন ইংলিশ টিলার ভুমি রক্ষায় ১৯৮৭ সালের ১ জানুয়ারি আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রেক্ষিতে ইজারাদার ইজারা শর্ত ভঙ্গ করায় সরকার টিলার বন্দোবস্ত বাতিল করে। সরকার নিয়ন্ত্রণ নেয় টিলার। তবে এ নিয়ে এখনো উচ্চ আদালতে এ বিষয়ে মামলা চলছে। 

এই মামলার মধ্যেই টিলার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুটি পক্ষ অবস্থান নেয়। তারা নিজেদের সুবিধাভোগী কিছু ভূমিহীন পরিবারকে সেখানে বসবাসের সুযোগ দিয়ে এখনো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা বহাল রেখেছে। এই অবস্থায় ২০১১ সনে সরকার দুই পক্ষের সুবিধাভোগী ২২টি পরিবারকে উচ্ছেদ করতে মামলা করে। উচ্ছেদ মামলা হলেও রহস্যজনক কারণে ইংলিশ টিলা থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে না।

সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের ব্যক্তিগত সহকারি মোশাহিদ আলী বলেন, ছাতকের ইংলিশ টিলা জেলার ঐতিহ্যবাহী পর্যটন স্থাপনা। ১৭০ বছরের আকর্ষণীয় স্থাপনাটি এখনো তার দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য্য ধরে রেখেছে। এটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রয়োজনেই সুরক্ষা জরুরি।

ছাতক উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা (এসিল্যান্ড) তাপস শীল জানালেন বন্দোবস্ত বাতিলের পর এটি সরকারি সম্পত্তি এখন। তবে এর মালিকানা নিয়ে এখনো উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ মামলা হলেও আদালতে মামলার কারণে কিছু করা সম্ভব হয়না। তবে ঐতিহাসিক দৃষ্টিনন্দন এই স্থানটির সুরক্ষার জরুরি।