উন্মুক্ত স্থানে হাসপাতাল!

by
https://cdn.banglatribune.com/contents/cache/images/350x0x1/uploads/media/2018/12/12/854722b2a45857ba24a617b06de6d120-5c10d079385a7.jpg
প্রভাষ আমিন

ঈদের আগের দিন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ফোন দিয়ে বললেন, দাদা সরকারকে বলুন ‘তারা যেন দ্রুত কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা বাড়ায়। প্রয়োজনে সব প্রাইভেট হাসপাতালের একটা অংশ যেন অধিগ্রহণ করে নেয়।’ তার কণ্ঠে এমন একটা আকুতি ছিল, আমি চমকে গেলাম। তিনি বলতে থাকলেন, ‘আমাদের কথা কেউ শুনবে না। আপনার লেখা অনেকে পড়েন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সচিব, ডিজি বা দায়িত্বশীল কারও চোখে পড়বে নিশ্চয়ই…।’ আমার সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করায় তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, ‘আপনার ধারণা ভুল। আমি একজন সামান্য ছাপোষা সাংবাদিক। আমি বিবেকের তাড়নায় লিখি। আমার লেখা অত উঁচু মহলে পৌঁছায় কিনা জানি না। আমার লেখা কিছু লোক পড়ে বটে, তবে তাদের অনেকেই গালি দেওয়ার জন্য পড়ে। বিএনপির পক্ষে গেলে আওয়ামী লীগ গালি দেয়, আওয়ামী লীগের পক্ষে গেলে বিএনপি গালি দেয়।’ তারপরও তার আকুতি থামে না, ‘গালি দিক আর যা-ই করুক; জাতীয় স্বার্থে আপনি লিখুন।’  এবার আমি তাকে থামালাম, ‘সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে তো অন্তত ১২টি হাসপাতালে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আরও লাগবে মনে হচ্ছে কেন?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘এই ছুটির মধ্যেও কোনও কোভিড হাসপাতালে কোনও আইসিইউ খালি নেই। বিছানাও প্রায় পূর্ণ।’ তিনি আরও বললেন, ‘কোভিড রোগীদের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে শ্বাসকষ্টের কারণে। সময় মতো অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে পারলে আইসিইউর ওপর চাপ কমবে এবং অনেকেরই জীবন বাঁচানো যাবে। সময় মতো প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দিতে না পারলে রোগী আইসিইউ বা ভেন্টিলেশনে চলে যায়, যেখান থেকে ফিরিয়ে আনা কঠিন।’ তিনি আরও জানালেন, ‘বাংলাদেশের অনেক বেসরকারি হাসপাতালে কেন্দ্রীয়ভাবে হাই-ফ্লো অক্সিজেন সরবরাহ আছে। মানুষের জীবন বাঁচাতে সেগুলো কাজে লাগানো দরকার।’ সেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বললেন, ‘এখন কোভিড হাসপাতালগুলোতে যেমন ভিড়, আবার নন-কোভিড হাসপাতালগুলোর ৮০ ভাগই ফাঁকা। এ অব্যবস্থাপনা দূর করে বিদ্যমান সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার দরকার, ভারসাম্য আনা দরকার।’ এরপর তিনি বললেন তার উদ্বেগের আসল কারণ, ‘ভাই মানুষ যেভাবে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে, তাতে এবারে অনেকের নাড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। ঈদের আগে শপিং, বাড়ি ফেরার ঢল এবং বাড়ি থেকে ঢাকায় ফেরা- সব মিলিয়ে বিপর্যয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত। ঈদের সপ্তাহ দুয়েক পর কোভিড রোগীর যে ঢল নামতে পারে, তা সামলানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। এখন থেকেই প্রস্তুতি না নিলে সেই বিপর্যয় সামাল দেওয়া মুশকিল হবে।’ এতক্ষণে তার শঙ্কা-উদ্বেগের আসল কারণটা বুঝলাম। তার উদ্বেগের সঙ্গে আমি ষোলোআনা একমত। তবে সেটা গোপন করে একটু মজা করলাম, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লাখো মানুষের জানাজায় অংশ নেওয়ার পরও সেখানে কিছু হয়নি। গার্মেন্টস শ্রমিকদের তেমন কিছু হয়নি। ঢাকার অধিকাংশ বস্তি বা ক্যাম্প, যেখানে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, সেখানে কিন্তু করোনার উৎপাতও নেই। করোনাকে তো আমার অভিজাত ভাইরাস মনে হচ্ছে। এস আলম গ্রুপের মালিক, সাবেক সাংসদ, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা, ডাক্তার, সাংবাদিক, পুলিশই তো আক্রান্ত হচ্ছে বেশি; মারাও যাচ্ছে বেশি।’ আমার কথা শুনে তিনি একটু মনক্ষুণ্ন হলেন, মুখের ওপরই বললেন, ‘আপনাকে তো রিজনেবল মানুষ বলেই জানতাম, আপনিও যদি অবুঝের মতো কথা বলেন, তাহলে কে বুঝবে। আপনি যেসব জায়গার কথা বললেন, সেসব জায়গায় টেস্টিং সুবিধা হয়তো পৌঁছায়নি, কিন্তু করোনাভাইরাসও পৌঁছায়নি; তেমন গ্যারান্টি আপনি দিতে পারবেন না। বাংলাদেশে টেস্টিং সুবিধা এখনও সহজলভ্য নয়। তাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিদিনের ব্রিফিং দিয়ে করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করা ঠিক হবে না। করোনাভাইরাস হয়তো এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেখানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পৌঁছাতে অনেক সময় লাগবে। এই যে আমরা বলছি, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-গাজীপুরে সংক্রমণ বেশি; হয়তো বেশি, কিন্তু বেশি দেখা যাওয়ার মূল কারণ এসব এলাকার মানুষ করোনা টেস্ট সুবিধার আওতায় আছে। কিন্তু ভোলা, পঞ্চগড় বা রাঙামাটির মতো দুর্গম এলাকার মানুষ তো চাইলেই টেস্ট করাতে পারবে না। দেশের বিভিন্ন দুর্গম এলাকা বা আপনার কথিত এলাকার গরিব মানুষগুলোরও জ্বর হয়; কেউ ভালো হয়ে যায়, কেউ মরে যায়। এদের নাম সরকারি কোনও পরিসংখ্যানে ওঠে না। কিন্তু আমাদের সব মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে। আমাদের কাছে এস আলমের মালিকের জীবন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কড়াইল বস্তির মানুষটির জীবনও মূল্যবান। তাই আমাদের সব মানুষের কাছে টেস্ট সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে; পিসিআর টেস্ট না হলে, গণস্বাস্থ্যের মতো র‌্যাপিড টেস্টিং কিটের মাধ্যমে হলেও টেস্ট করতে হবে। সবার জন্য ন্যূনতম চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।’ তার সিরিয়াসনেস দেখে আমার আর মজা করার সাহস হয় না। আমি বললাম, ‘আমি মজা করছিলাম। কিন্তু আপনার সঙ্গে ষোলোআনা একমত। আমি অবশ্যই দেশের স্বার্থে আপনার পরামর্শ নিয়ে লিখবো।’

ঈদকে সামনে রেখে গত ১০ মে থেকে শপিং মল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বলা ছিল, সব দোকান ও মলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। কিন্তু মানুষের ভিড়ে সব বিধি উড়ে গেছে। অধিকাংশ মানুষ কোনোরকমে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে শিশুসহ সপরিবারে শপিংয়ে গেছেন। ভিড়ের ঠেলায় সেখানে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করাও সম্ভব ছিল না। ভিড়ের কারণে দেশের অনেক এলাকায় শপিং মল বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে দোকানের শাটার নামিয়ে বেচাকেনা হয়েছে। পুলিশের অভিযানে দৌড়ে পালানো বা শপিং মলের টয়লেটে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। শপিং তো নয়, যেন দারুণ ‘এক্সাইটিং চোর-পুলিশ খেলা’। অনেকের বেপরোয়া আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, এটাই বুঝি শেষ ঈদ, শেষ শপিং।

শপিংয়ের পর আসে নাড়ির টান। বাড়ি ফেরার জন্য প্রায় পাগল হয়ে যান অনেকে। অথচ সরকার আগে থেকেই বলছিল, এবার যেন সবাই নিজ নিজ অবস্থানে ঈদ করেন। এ কারণে সাধারণ ছুটির পাশাপাশি ঈদের সময় ৭ দিন যান চলাচলে কঠোর কড়াকড়ি আরোপের কথা বলা হচ্ছিল। পুলিশের আইজি ঢাকা থেকে তো দূরের কথা, বাসা থেকেই বের হতে নিষেধ করেছিলেন। ডিএমপি কমিশনার বলেছিলেন, কেউ পায়ে হেঁটে যেতে চাইলেও যেতে দেওয়া হবে না। ঈদ পর্যন্ত রাস্তায় বসিয়ে রাখা হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ জেনে গেছে, সরকার আর পুলিশের এসব হুমকি ফাঁকা আওয়াজ মাত্র। গত দুই মাসে সরকার সবচেয়ে নরম, মানবিক, মানবাধিকার সচেতন। তাই তো ঈদের আগে বাড়ি ফেরার বেপরোয়া স্রোত শুরু হয়। পণ্যবাহী ট্রাক, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেটকার, সিএনজি, রিকশা, ভ্যান, পায়ে হেঁটে- যে যেভাবে পেরেছেন; ঢাকা ছাড়ার চেষ্টা করেছেন। মহাসড়কে, ফেরিঘাটে ছিল জনস্রোত। সরকারের বজ্র আঁটুনির চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ফস্কা গেরো হয়েছে। ঘর থেকে বেরিয়ে পড়া মানুষগুলোকে কোনও একটা গন্তব্যে পৌঁছে দিতে প্রাইভেট গাড়ির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। তারপর মহাসড়কে গাড়ির ঢল নামে। অনেকে বলেন, আমরা তো সরকারি নির্দেশনা মেনেই গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি। এটা আসলে এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। হঠাৎ আপনারা সরকারের নির্দেশ মানা বাধ্য নাগরিক হয়ে গেলেন। কিন্তু সরকার যখন ঘরে থাকতে বলেছিল, তখন তো আপনারা ঘরে থাকেননি। সবসময় সরকারের সব সিদ্ধান্ত আপনারা মানেন তেমনও তো নয়। সরকার শপিং মল খুলে দিয়েছে, প্রাইভেট গাড়ি চলাচল শিথিল করেছে। কিন্তু সরকার তো আপনাদের শপিং বা বাড়ি যেতে বাধ্য করেনি। আর সরকার বললেই আপনাকে সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে, তেমনও তো কথা নেই। নিজের ভালো তো পাগলেও বোঝে, আপনি বুঝবেন না কেন। এরপর করোনায় আক্রান্ত হলে আপনি তো সেই সরকারকেই গালি দেবেন। সরকার কেন ভালো হাসপাতালের ব্যবস্থা করলো না, হাসপাতালে কেন ডাক্তার নেই, পুলিশ কেন বাধা দিলো না, সাংবাদিক কেন সঠিক খবর দিলো না- আপনার গালি দেওয়ার লোকের অভাব নেই। অথচ নিজে নিয়ম মেনে চললে আপনার কাউকেই গালি দিতে হতো না। আগে বাঁচুন, তারপর প্রাণখুলে গালি দিয়েন।

ঈদের দিন এবং পরদিন ঢাকার রাস্তার অবস্থা দেখে সেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শঙ্কাটা আমার মধ্যেও চেপে বসেছে। নিছক শঙ্কা নয়, রীতিমতো আতঙ্ক। দুই ঈদ, দুর্গাপূজা, পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন, ভ্যালেন্টাইনস ডে’তে ঢাকার রাস্তায় রংবেরঙের পোশাক পরা আনন্দে উচ্ছল নারী-পুরুষ শিশুদের দেখতে আমার দারুণ লাগে। অফিসে যাওয়া-আসার পথে আমি মন ভরে দেখি। এক রিকশায় পাঁচ জন, মোটরসাইকেলে তিন জন, রাস্তায় হল্লা করে আড্ডা মারার ছবি সত্যি মন ভরিয়ে দেয়। ভেবেছিলাম এবার সেই দৃশ্য দেখা হবে না। কিন্তু বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার পথে চন্দ্রিমা উদ্যানের সামনের রাস্তায় রীতিমত জ্যাম দেখে চমকে গেলাম। অফিসে গিয়ে শুনলাম এবং দেখলাম হাতিরঝিল, মিরপুর বেড়িবাঁধ, মানিক মিয়া এভিনিউ, পূর্বাচল- সব উন্মুক্ত স্থানেই উপচেপড়া ভিড়। নতুন কাপড় পরা, ঝলমলে সব মুখ দেখে আমার খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তাদের হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকা কান্নাটা দেখতে পাচ্ছি আমি, যা মন খারাপ করে দিয়েছে। সেই চিরচেনা দৃশ্য যেন। গাদাগাদি করে রিকশা বা ভ্যানে চড়া, মোটরসাইকেলে তিন জন, মুখে মাস্ক নেই, দূরত্বের বালাই নেই; যেন সব স্বাভাবিক। অথচ এখন সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি ছাড়া করোনাভাইরাসের আর কোনও প্রতিষেধক এখনও আবিষ্কার হয়নি। আমি খালি দেখি আর ভাবি এই ছেলেমেয়েগুলোর কি কোনও অভিভাবক নেই? তারা কোন সাহসে সন্তানদের অমন বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারলেন? সরকারই বা কেন সেটা হতে দিলো।

সরকারের এক আদেশেই তো থার্টিফার্স্ট নাইটে রাস্তা শূন্য থাকে। তাহলে ঈদের দিনে উন্মুক্ত স্থানগুলো বন্ধ করা হলো না কেন?

সবাই যে অসচেতন তা কিন্তু নয়। ঢাকার একটা বড় অংশের মানুষ এখনও ঘরেই আছেন। আমাদের বিল্ডিংয়ে আমি ছাড়া আর কেউ বের হয় না। আমার কলেজপড়ুয়া ছেলে প্রসূন ১৭ মার্চের পর থেকে আজ পর্যন্ত শুধু একদিন ৮ মিনিটের জন্য বেরিয়েছিল। তাও তার মায়ের কাছে অনেক আবেদন নিবেদন করে। তাও আমি তাকে নিয়ে গাড়ি দিয়ে একটা চক্কর দিয়েছি, কোথাও নামতে দেইনি। কিন্তু ঘরে থেকেও কিন্তু আপনি বিপদে পড়তে পারেন। ধরুন আপনার বাসায় ১০ জন সদস্য। ৯ জনই ঘরে থাকেন। একজন তরুণ কারও কথা শোনে না, ঘুরে ফিরে বেড়ায়। সে করোনা আক্রান্ত হলেও তিন দিন জ্বরে ভুগে হয়তো ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু তার বয়ে আনা ভাইরাস বাসার প্রবীণ সদস্যটিকে তিন দিনের মধ্যে আইসিইউতে নিয়ে যেতে পারে। তাই সাবধানতাটা সবার জন্যই জরুরি, সবাই মিলেই জরুরি।

ঈদের ঘোরাফেরা নিয়ে এটিএন নিউজের শিরোনাম ছিল, ‘করোনা আতঙ্কেও উন্মুক্ত স্থানে উপচেপড়া ভিড়; উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি।’ অনেক রিপোর্ট এবং রাস্তার ছবি দেখে আমার ভয় হচ্ছে। সেই ডাক্তারের পরামর্শ মতো বেসরকারি হাসপাতাল নিয়েও হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। এদের জন্য হয়তো উন্মুক্ত স্থানেই হাসপাতাল বানাতে হবে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ